ছবি:সংগৃহীত
বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর) বিভিন্ন দেশ থেকে দেশে এসেছে ৪ হাজার ৬০টি প্রবাসী কর্মীর মরদেহ। অর্থাৎ এ সময়ে প্রতিদিন গড়ে ১৪টির বেশি মরদেহ দেশে এসেছে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি প্রবাসী কর্মীর মৃত্যু হয়েছে সৌদি আরবে। চলতি বছর দেশটিতে প্রায় ২ হাজার বাংলাদেশি কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। এরপর সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে মালয়েশিয়ায়। দেশটিতে গত আড়াই বছর ধরে বাংলাদেশি কর্মীদের নতুন করে কর্মসংস্থান বন্ধ রয়েছে।
২০১৯ সালে দেশে আসে ৩ হাজার ৬৫১ প্রবাসীর মরদেহ। ২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ১৪০ জনে। ওই সময়ে অনেক মরদেহ দেশে না এনে গন্তব্য দেশেই দাফন করা হয়। ২০২১ সাল থেকে দেশে আসা মরদেহের সংখ্যা আবার বাড়তে থাকে।
তথ্য অনুযায়ী, করোনাকাল বাদ দিলে বিদেশে মারা যাওয়া বাংলাদেশি কর্মীদের এক শতাংশেরও কমকে গন্তব্য দেশে দাফন করা হয়। অধিকাংশ মৃত কর্মীর মরদেহ পরিবার দেশে ফিরিয়ে আনতে চায়।
দুর্ঘটনায় মৃত্যু ১৬ শতাংশের বেশি
চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে দেশে আসা প্রবাসী কর্মীদের মরদেহের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৬৬ শতাংশের মৃত্যুর কারণ হিসেবে স্বাভাবিক মৃত্যু উল্লেখ করা হয়েছে। বাকি ৩৪ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন কারণে।
মোট মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, আগুনে পোড়া, ভবন থেকে পড়ে যাওয়া এবং বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর হার ১৬ শতাংশের বেশি।
এর আগে ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে আসা ১৮ হাজার ১৬৬টি মরদেহের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, আগুনে পোড়া, ভবন থেকে পড়ে যাওয়া ও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান ৩ হাজার ৬৯৮ জন।
ওই পাঁচ বছরে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনায়-২ হাজার ৬৪৯ জন। সব মিলিয়ে কর্মক্ষেত্র এবং কর্মস্থলে যাতায়াতের সময় বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনায় ২০ শতাংশের বেশি প্রবাসী কর্মীর মৃত্যু হয়েছে।
মরদেহ দেশে আনতে জটিলতা
বিদেশে কোনো বাংলাদেশি কর্মীর মৃত্যু হলে তাঁর মরদেহ দেশে আনার দায়িত্ব নেয় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। নিয়মিত কর্মীদের মরদেহ সাধারণত তুলনামূলক কম সময়ে দেশে আনা সম্ভব হলেও অনিয়মিত কর্মীদের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে মরদেহ দেশে আনতে একাধিক দপ্তরের অনুমোদন নিতে হয়। ফলে কিছুটা সময় লাগে। যেসব দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস নেই, সেসব দেশ থেকে মরদেহ দেশে আনতে আরও বেশি সময় লাগে।
মরদেহ দেশে আনতে কর্মীর পরিবারকে আবেদন করতে হয়। কর্মী বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে বিদেশে গেলে অথবা বিদেশে যাওয়ার পর দূতাবাসে সদস্য হিসেবে নিবন্ধিত থাকলে তাঁর মরদেহ দেশে আনার ব্যয় ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড বহন করে। এসব সুবিধা না থাকলেও পরিবার আবেদন করতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়।
মৃত কর্মীর পরিবারকে আর্থিক সহায়তা
দেশে আসা প্রতিটি মৃত কর্মীর দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা নগদ সহায়তা দেয় ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। এর পাশাপাশি মৃত কর্মীর পরিবারকে তিন লাখ টাকা করে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়।
এ ছাড়া বর্তমানে মৃত কর্মীর পরিবার জীবন বিমার সুবিধা পেয়ে থাকে। বিদেশে কর্মীর কোনো ক্ষতিপূরণ বা বকেয়া পাওনা থাকলে দূতাবাসের মাধ্যমে তা আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মৃত কর্মীদের মরদেহ দাফনের জন্য ৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে আর্থিক অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়েছে ৬১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। কর্মীদের বিমাসুবিধা বাবদ দেওয়া হয়েছে ৪৪ কোটি টাকার বেশি। বিদেশ থেকে ক্ষতিপূরণ, বকেয়া ও বিমার অর্থ আদায় করে দেওয়া হয়েছে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা।
মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ের ওপর গুরুত্ব
অভিবাসন খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশে বাংলাদেশি কর্মীদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা জরুরি। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হিসেবে স্বাভাবিক মৃত্যু উল্লেখ করা হলেও কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, অতিরিক্ত তাপ, শারীরিক নির্যাতন, আত্মহত্যা কিংবা অন্যান্য কারণ যথাযথভাবে যাচাই করার সুযোগ সীমিত।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় কাজ করার কারণে বাংলাদেশি কর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। অতিরিক্ত তাপের কারণে কিডনি, হৃদ্যন্ত্র, শ্বাসতন্ত্রসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এসব অঞ্চলে তাপমাত্রা আরও বাড়ায় ঝুঁকি বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের মৃত্যুর কারণ নিয়মিতভাবে বিশ্লেষণ করা গেলে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্র চিহ্নিত করা এবং মৃত্যুর হার কমাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বিদেশগামী কর্মীদের গন্তব্য দেশের কাজের পরিবেশ, কর্মঘণ্টা, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নিরাপত্তা সম্পর্কে আরও কার্যকর প্রশিক্ষণ দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সূত্র: প্রথম আলো
জৈন্তা বার্তা/ ওয়াদুদ




